• ঢাকা |

চট্টগ্রাম বন্দর: সিন্ডিকেটের পুনরুত্থান, নাকি দক্ষতার পথে অগ্রযাত্রা?


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মো: মুখলেছুর রহমান: চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ এই বন্দর দিয়েই সম্পন্ন হয়। ফলে বন্দরের কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিচালনা শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অপারেটর হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনার পরও এখন দেশীয় একটি কনসোর্টিয়ামের আগ্রহ ও তৎপরতার খবর আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে সক্রিয় হয়েছেন।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। প্রশ্ন হলো—জাতীয় স্বার্থে কোন পদ্ধতি সবচেয়ে উপযোগী, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক?

বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমালোচনার মুখে। জাহাজের অপেক্ষার সময়, কনটেইনার খালাসে বিলম্ব, অতিরিক্ত লজিস্টিক ব্যয় এবং অপারেশনাল অদক্ষতা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বহুবার উল্লেখ করেছে যে, বন্দর দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।

এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কোনো অপারেটরকে যুক্ত করার আলোচনা নতুন কিছু নয়। বিশ্বের বহু উন্নত ও ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর বেসরকারি কিংবা আন্তর্জাতিক অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেখানে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো দক্ষতা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং সেবার মান।

অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরেও সক্ষম কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলে তাদেরও প্রতিযোগিতার সুযোগ অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্তু সেই সুযোগ হতে হবে উন্মুক্ত, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ডে উন্নীত। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার প্রভাব বা বিশেষ সুবিধার ভিত্তিতে নয়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। অতীতে বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর একচ্ছত্র ব্যবসায়িক সুবিধা ভোগের ঘটনাও জনসমক্ষে এসেছে। ফলে জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আবার সেই পুরোনো চক্রে ফিরে যাচ্ছি?

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest)। যদি কোনো জনপ্রতিনিধি বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সরকারি চুক্তি ও ব্যবসায়িক সুবিধার সঙ্গে যুক্ত হন, তাহলে নৈতিক ও আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়াই স্বাভাবিক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শুধু আইনের শাসনই যথেষ্ট নয়; জনগণের আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত অবকাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কোন প্রতিষ্ঠান কী যোগ্যতায় আবেদন করেছে, তাদের অভিজ্ঞতা কী, বিনিয়োগ পরিকল্পনা কী, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির রূপরেখা কী—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপারেটরের সঙ্গে পূর্ববর্তী আলোচনার অবস্থা এবং জাতীয় স্বার্থে কোন বিকল্প অধিক লাভজনক হবে, তাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত।

বাংলাদেশ এখন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন ঘটলে দেশের নীতিগত ধারাবাহিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিনিয়োগকারীরা শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নয়, নীতির স্থিতিশীলতা এবং চুক্তির প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিকেও গুরুত্ব দেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়, কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক স্বার্থেরও নয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। তাই এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দলীয় বিবেচনা নয়, জাতীয় স্বার্থই হতে হবে একমাত্র মানদণ্ড।

বাংলাদেশের মানুষ অতীতের সিন্ডিকেট, বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তারা দেখতে চায় একটি আধুনিক, দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক এবং বিশ্বমানের বন্দর। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই পথে এগোব, নাকি আবারও পুরোনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেব?

মো: মুখলেছুর রহমান।

[অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও কলামিস্ট]