• ঢাকা |

মুসলিমের সবচেয়ে বড় জিহাদ, অধিকৃত মুসলিম ভূমি এবং শত্রুশক্তির নাশকতা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুলাই, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এবং কুর’আন যেখানে অস্ত্র 

দেহ বাঁচাতে নিয়মিত পানাহার চাই। নইলে মৃত্যু অনিবার্য। তেমনি ঈমান বাঁচাতে নিয়মিত কুর’আনী জ্ঞান চাই। নইলে ঈমানের মৃত্যু অনিবার্য। অনাহারে মারা যাওয়াতে কেউ জাহান্নামে যাবে না। কিন্তু নিশ্চিত জাহান্নামে যাবে অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত নিয়ে বাঁচার কারণে। অজ্ঞতাই মানবের সবচেয়ে বড় দুশমন -যা জাহেল তথা অজ্ঞ ব্যক্তি লালন করে তার চেতনার ভূমিতে। অজ্ঞতা অসম্ভব করে সিরাতাল মুস্তাকীম চেনা এবং সে পথে চলা। তাই মানুষকে শুধু অর্থ ও খাদ্য সংগ্রহের লড়াই নিয়ে বাঁচলে চলে না, তাকে অবশ্যই বাঁচতে হয় অজ্ঞতার বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে। অর্জন করতে হয় কুর’আনী জ্ঞান। মানব জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে পবিত্রতম লড়াই। মানুষ কতটা সভ্য, ভদ্র ও ঈমানদার হবে তা নির্ভর করে সে কতটা নিজের অজ্ঞতা নির্মূলের যুদ্ধে সফল হলো তার উপর। তাঁর নিজের ঈমান নিয়ে বাঁচা ও বেড়ে উঠাটি নির্ভর করে অজ্ঞতা নির্মূলের উপর। সে লড়াইটি না থাকলে তাকে বাঁচতে হয় নিছক প্রাণসম্পন্ন ও ঈমানশূণ্য এক ইতর জীব রূপে। আখেরাতে এরাই জাহান্নামের জ্বালানী হয়। পবিত্র কুর’আনে এ বার্তাটি বার বার দেয়া হয়েছে।  

ব্যক্তির ঈমানের গভীরতা পুরোপুরি নির্ভর করে তার কুর’আনী জ্ঞানের গভীরতার উপর। কারণ ঈমানের খাদ্য হলো এই কুর’আনী জ্ঞান। তাই কুর’আনের আয়াত শোনালে তথা কুর’আনী জ্ঞানে বৃদ্ধি ঘটলে ঈমানদারের ঈমানও বৃদ্ধি পায়। সে কথাটি বলা হয়েছে নিচের আয়াতে। বলা হয়েছে:

وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

অর্থ: “আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কুর’আনের আয়াত, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা ভরসা পোষণ করে স্বীয় পরওয়ারদেগারের প্রতি।” - (সুরা আনফাল, আয়াত ২)।

অজ্ঞতা নির্মূলের লড়াইটি হলো মানব জীবনের সবচেয়ে পবিত্রতম ও শ্রেষ্ঠতম লড়াই। মানব জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ থাকতে পারে না। বস্তুত এখান থেকেই শুরু হয় মানবিক গুণে এবং ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার কাজ। এ লড়াই মাগফিরাত লাভ তথা জান্নাত লাভের জন্য প্রস্তুত করার লড়াই। যার জীবনে এ লড়াই নাই, বুঝতে হবে তার তাড়না নাই নিজেকে জান্নাতের জন্য প্রস্তুত করার। এমন মানুষেরাই জাহান্নামমুখী স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়। এরা সংখ্যায় কোটি কোটি। এরা কুর’আন তেলাওয়াত, নামাজ রোজা এবং হজ্জ যাকাত পালন করেও ঘুষখোর, সূদখোর, চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও স্বৈরাচারী খুনি হয়। এসবই ঘটে অজ্ঞতা নির্মূলের লড়াইয়ে তাদের ব্যর্থ হওয়ার কারণে। আর অজ্ঞতার গর্ভেই জন্ম নেয় সকল প্রকার বিদ্রোহ, বেঈমানী ও পাপাচার।

নবীজী (সা:)’য়ের আমলে ইসলামের সর্বপ্রথম জিহাদটি কোন জালেম শাসক বা বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে ছিল না, সেটি ছিল নিজ মনের অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াতের বিরুদ্ধে। এটিকেই মহান আল্লাহ তায়ালা জিহাদে কবিরা তথা সবচেয় বড় জিহাদ বলেছেন। পবিত্র কুর’আ’ন হলো সে জিহাদের মূল হাতিয়ার। তাই সুরা ফুরকানের ৫২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাজহতায়ালার নির্দেশ: “জাহিদু বিহি জিহাদান কবিরা” অর্থ: “এই কুর’আন দিয়ে বড় জিহাদটি করো।” এটি হলো মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। নবীজী (সা:) তাঁর ১৩ বছরের মক্কী জীবনে তাঁর প্রতিটি সাহাবাকে এ জিহাদের সার্বক্ষণিক সৈনিকে পরিণত করেছেন। এবং সে জিহাদের ময়দান থেকেই তিনি বদর, ওহুদ, খন্দকের ন্যায় যুদ্ধে সশস্ত্র সৈনিক পেয়েছেন। এবং জিহাদের যে পাঠশালায় তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব তৈরী করেছেন।

মু’মিনের জীবনে অস্ত্রের জিহাদের সুযোগ নাও আসতে পারে। কিন্তু তাকে প্রতিদিন ও প্রতিমুহুর্ত বাঁচতে হয় এই বড় জিহাদ নিয়ে।  যে ব্যক্তি এ জিহাদে বিজয়ী হয়, একমাত্র সে ব্যক্তিই মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার নিরস্ত্র রাজনৈতিক জিহাদে এবং রণাঙ্গণের সশস্ত্র জিহাদে মুজাহিদে পরিণত হয়। যে ব্যক্তি অস্ত্রের জিহাদে নাই -বুঝতে হবে সে বড় জিহাদে তথা অজ্ঞতার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে বিজয়ী হতে ব্যর্থ হয়েছে। এরা নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালন করেও পরিণত হয় শয়তানের সৈনিকে। এরা নামাজ রোজা ও হজ্জ পালন করেও খুনি, সন্ত্রাসী, চোরডাকাত ও ভোটডাকাত হয়। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে এরাই ইসলামকে পরিজিত রেখেছে এবং বিজয়ী করেছে ফ্যাসিবাদ, জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের ন্যায় হারাম মতবাদগুলিকে। 

জ্ঞানের বিপ্লবই দর্শনের বিপ্লব আনে। দর্শনের বিপ্লব থেকে সৃষ্টি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব। সভ্য মানব, সভ্য সমাজ ও সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণের শুরু বস্তুত এ দর্শনের বিপ্লব থেকে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের শুরু বস্তুত এমন এক দর্শনের বিপ্লবের মধ্য দিয়েই। সেটি দেখা গেছে নবীজী (সা:)’য়ের আমলেও।  মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার কাজটি শুরু করেছিলেন এই কুর’আন দিয়েই। তাই কুর’আনের এরূপ প্রয়োগ মহান আল্লাহ তায়ালার সূন্নত। এজন্যই নবীজী (সা:)’য়ের উপর তাঁর প্রথম হুকুমটি ছিল “ইকরা” তথা পড়ো। নির্দেশ এখানে পবিত্র কুর’আন পড়ার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করা। এখান থেকেই শুরু হয় সিরাতাল মুস্তাকীমে চলা। তাই এই কাজটি সঠিক ভাবে সমাধা না করে পূর্ণ ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার কাজ কখনোই সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের আগে চেতনা নির্মাণে কাজটি হতে হয়; এবং সেটি হতে হয় কুর’আনের জ্ঞানে। সে কাজটি না হওয়ায় অতীতে বহু দেশে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ ব্যর্থ হয়ে গেছে। সে ব্যর্থতার মূল কারণ, শুরুর কাজটি তারা শুরুতে করেননি। পাকিস্তান তার উদাহরণ। ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই দেশটির রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি এবং সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলি ছিল সেক্যুলারিস্টদের হাতে অধিকৃত। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের ন্যায় বিদেশী শত্রুগণ দেশত্যাগ করলেও তাদের হাতে এবং তাদের সেক্যুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেড়ে উঠা ইসলামের দেশী শত্রুগণ দেশ ত্যাগ করেনি। এরাই ছিল পাকিস্তানের deep state। প্রশাসনের গভীরে বসে তারা পরিকল্পিত ভাবে অসম্ভব করা হয় স্কুল-কলেজে কুর’আন থেকে শিক্ষা দেয়ার কাজ। এবং অসম্ভব করে ইসলামীকরণের কাজ। ফলে সহজেই বিজয় পায় শয়তানের এজেন্ডা; এতে ভেঙে যায় ইসলামের নামে অর্জিত পাকিস্তান। পাকিস্তানের ব্যর্থতার শুরুটি নাগরিকদের ঈমানদার রূপে গড়ে তোলার ব্যর্থতা থেকে। আর যারা ঈমানদার হতে ব্যর্থ হয়, তারাই তো বেঈমান হয়। নিজ দেশে গড়ে উঠা সে বেঈমানদের বেঈমানী দৃশ্যমান হয় ১৯৭১’য়ে। তারা নিজ দেশ পাকিস্তান ভাঙতে ভারতের ন্যায় কাফির দেশের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে নামে এবং ভারতকে বিজয়ী করে। এভাবেই পাকিস্তান ভাঙার ভারতীয় এজেন্ডাকে তারা বিজয়ী করে।

ঈমানদারের রাজনীতি মানেই সর্বোচ্চ ইবাদত তথা জিহাদ। ইসলাম কতটা প্রতিষ্ঠা পাবে এবং মুসলিম উম্মাহ কতটা বিজয়ী হবে -তা নির্ভর এই রাজনৈতিক অঙ্গণের জিহাদের উপর। কিন্তু মুসলিম নামধারী বেঈমানগণ যুগে যুগে রাজনীতিকে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নাশকতার হাতিয়ারে পরিণত করেছে। তাদের সে নাশকতায় ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বিপদে পড়েছে, তেমনি আজ বিপদে পড়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা। কারণ, বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ইসলামের দেশী ও বিদেশী দুশমনদের চারণভূমিত। ঈমানধ্বংসী এ রাজনীতি অব্যাহত থাকলে তা আখেরাতে নিশ্চিত জাহান্নামে হাজির করবে। শংকার আরো কারণ হলো, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভেসে চলছে সে জাহান্নামুখী সেক্যুলার রাজনীতির স্রোতে। জাহান্নামের স্রোতে আভাস মেলে দেশে দুর্বৃত্তির জোয়ার দেখে। কারণ যারা জাহন্নামের যাত্রী, পাপের প্লাবন নিয়ে বাঁচাই তাদের সংস্কৃতি। ফলে বাংলাদেশকেও তারা পাপাচারে পূর্ণ করছে।    

নবীজী (সা)’র শ্রেষ্ঠ মোজেজা

হযরত মূসা (আ:)’র মোজেজা ছিল, তাঁর হাতের লাঠিটি মাটিতে ফেললে সেটি সর্পে পরিণত হতো এবং নড়াচড়া করতো। তাঁর হাত বগলে রাখলে তা সাদা হয়ে বেরিয়ে আসতো। সে মোজেজা নিয়ে তিনি ফিরাউনের দরবারে হাজির হয়েছিলেন।  হযরত ঈসা (আ:)’র মোজেজা ছিল, তিনি মৃতকে জীবিত করতেন; দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মানুষকে সুস্থতা দিতেন। কিন্তু নবীজী (সা:)’য়ের মোজেজা ছিল ভিন্নতর। তিনি মাত্র ২৩ বছরে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এক দল মানব গড়েছেন এবং প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রের। মানব গড়া ও রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ -এ দু’টি বিশাল কাজ তিনি একত্রে করেছেন। উভয় অঙ্গণে নির্মিত হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বরেকর্ড। নবীজী (সা:)’য়ের পূর্বে আরবগণ অসংখ্য গোত্রে বিভক্তি ছিল, তাদের কোন রাষ্ট্র ছিল। নবীজী (সা:)’য়ের হাতে সেখানে উদ্ভব ঘটে তৎকালীর বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তির।  

রাষ্ট্র নির্মাণে নবীজী (সা:)’য়ের এ বিস্ময়কর সাফল্য নিজেই এক বিশাল মোজেজা। নবীজী (সা:)’য়ের নির্মিত সে রাষ্ট্রের বুকে নির্মিত হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও সংস্কৃতি। এটিই হলো নবীজী (সা:)’য়ের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বা লিগ্যাসি। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কল্যাণটি করেছে নবীজী (সা:)’য়ের এ রাজনৈতিক অর্জন। তাঁর হাতে নির্মিত রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে জনগণকে জান্নাতে নেয়ার বাহনে। সে রাষ্ট্র নির্মিত না হলে পৃথিবীর বিশাল ভূ-ভাগ থেকে মিথ্যা ধর্ম, অসত্য দর্শন, জুলুম, অবিচার ও দুর্বৃত্তির নির্মূল হতো না। নারীরা মর্যাদা পেত না; দাসগণ মুক্তি পেত না দাসত্ব থেকে। সত্য, সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার কাজটি শুধু স্বপ্নই থেকে যেত। এবং সম্ভব হতো না কোটি কোটি মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর কাজ। মানব জাতির জন্য এতো বড় কল্যাণকর কাজটি লক্ষ লক্ষ মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ করে করা যেত না, যেমন আজ করা যাচ্ছে না।       

স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ দান হলো পবিত্র কুর’আন

মানুব জাতির জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান হলো পবিত্র কুর’আন। এ পবিত্র কিতাবই জান্নাতের পথ দেখায়। তাই যে ব্যক্তি কুর‌’আন বুঝে এবং দৃঢ় ভাবে তাঁর বিধানকে আঁকড়ে ধরে -একমাত্র সে ব্যক্তিই জান্নাতের পথে চলার হিদায়েত পায়। সে ঘোষণাটি এসেছে পবিত্র কুর’আনে। বলা হয়েছে:

وَكَيْفَ تَكْفُرُونَ وَأَنتُمْ تُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ ءَايَـٰتُ ٱللَّهِ وَفِيكُمْ رَسُولُهُۥ ۗ وَمَن يَعْتَصِم بِٱللَّهِ فَقَدْ هُدِىَ إِلَىٰ صِرَٰطٍۢ مُّسْتَقِيمٍۢ

অর্থ: “অতঃপর তোমরা কিরূপে প্রত্যাখান করবে সত্যকে যখন তোমাদের তেলাওয়াত করে শোনানো হয় কুর’আনের আয়াত এবং তোমাদের মাঝে রয়েছেন তাঁর রাসূল। এবং যে আল্লাহকে (তথা তাঁর প্রদর্শিত পথ কুর’আনকে) দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে ধরে -সেই হিদায়েত পায় সিরাতাল মুস্তাকীমের পথে।” -(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০১)।

উপরিউক্ত আয়াতে যা সুস্পষ্ট করা হয়েছে তা হলো, কুর‌’আনের পথই হলো হিদায়েতের একমাত্র পথ। বাকি সকল পথই নেয় জাহান্নামে। তাই যে জান্নাতে পৌঁছতে চায় তাঁকে অবশ্যই শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরতে হয় পবিত্র কুর’আনকে। কুর’আনকে আঁকড়ে ধরার অর্থ: কুর’আন বুঝা এবং কুর’আনের শিক্ষাকে পদে পদে অনুসরণ করা। সেটিই হলো সিরাতাল মুস্তাকীম। তাই যে ব্যক্তি দূরে সরে পবিত্র কুর’আন থেকে, সে ব্যক্তি বিচ্যুৎ হয় জান্নাতের পথ থেকে। এমন ব্যক্তিরাই ধাবিত হয় জাহান্নামের দিকে। তাই যারা জনগণকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে চায় এবং তাদেরকে জান্নাতে নিতে চায় তারা জনগণের মাঝে কুর’আন বুঝার সামর্থ্য সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহ তায়ালা কেন নামাজ রোজার ফরজ করার আগে কুর’আন থেকে জ্ঞান লাভকে ফরজ করেলেন -সেটি বুঝা যায় কুর‌’আনের সে গুরুত্বকে সামনে রাখলে।

মুসলিম দেশে বিজয় পেয়েছে শয়তানের এজেন্ডা

শয়তান ও তার অনুসারীদের লক্ষ্য এবং স্ট্র্যাটেজি হলো মহান রব’য়ের এজেন্ডার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের লক্ষ্য, মানুষকে জাহান্নামে নেয়া। সেটি তখন বুঝা যায় যখন তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পায়। সে লক্ষ্য পূরণে তাদের মূল স্ট্র্যাটেজি হলো, জনগণকে কুর’আন থেকে দূরে সরানো। সে লক্ষ্য পূরণে তারা দেশের স্কুল কলেজে কুর’আন থেকে শিক্ষাদান বন্ধ করে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে শয়তান ও তার অনুসারীদের বিজয় এ ক্ষেত্রে বিশাল। দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর বহু লক্ষ ছাত্র শিক্ষা সমাপ্ত করে বের হয়। কিন্তু তাদের অধিকাংশই কুর’আন বুঝতে অক্ষম।  প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তি কুর’আন পড়লো না এবং পড়লেও কুর’আনের কথাগুলি বুঝলো না -এমন ব্যক্তি কুর’আনের পথে চলবে কিরূপে? জাহান্নামের পথ থেকে সে বাঁচবে কিারূপে? পরিতাপের বিষয় হলো, বিপুল অর্থ, শ্রম ও সময় ব্যয় করেও একজন মুসলিম ছাত্রের এতে জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় হয়না। অথচ নামাজ রোজার ন্যায় জ্ঞানার্জনের ফরজও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রশ্ন হলো, জ্ঞানার্জনের ফরজ পালিত না হলে অন্য ইবাদতগুলি কিরূপে সঠিক ভাবে পালিত হবে? এমন ব্যর্থ শিক্ষা ব্যবস্থার দেশে কি ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে মুজাহিদ জুটে? অজ্ঞতা নিয়ে কি মুসলিম হওয়া যায়? জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায়ে যারা ব্যর্থ হয়, তারাই তো বেঈমান হয় এবং শয়তানী বাহিনীর সৈনিক হয়। বাংলাদেশে এদের সংখ্যাটি বিশাল; দেশের রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ময়দান তো এদেরই দখলে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদকে তারা সফল ভাবে প্রতিহত করতে পারছে।

পবিত্র কুর’আন পথ দেখায়। সেটি শুধু ঈমান, আমল, আখলাক ও পরিবার গড়ায় নয়, বরং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণেও। পৃথিবী পৃষ্ঠে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ইসলামী রাষ্ট্রের মূল এজেন্ডা হলো নাগরিকদের সিরাতাল মুস্তাকীম চিনতে ও সে পথে চলতে সাহায্য করা এবং পূর্ণ ইসলাম পালনের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। সে সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ, মহান রাব্বুল আলামীন থেকে মাগফিরাত লাভে জনগণের সামর্থ্য বাড়ানো। সেটি জনগণের মাঝে কুর’আন শিক্ষা ও কুর’আনী বিধানের অনুসরণকে তথা পূর্ণ ইসলাম পালনকে সহজতর করে। সে সাথে রাষ্ট্রের বুক থেকে শয়তানের জাহান্নামমুখী প্রকল্প তথা বাহনগুলিকে নির্মুল করে। এছাড়া ইসলামী রাষ্ট্র তীব্রতর করে মিথ্যা দর্শন, মিথ্যা মতবাদী রাজনীতি ও মিথা ধর্মের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধকে। এভাবেই পৃথিবীপৃষ্ঠের বুকে নির্মিত হয় নারী পুরুষের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান ইসলামী রাষ্ট্র।

খাদ্যপানীয় সংগ্রহ ও গৃহনির্মাণের কাজটি জনগণ নিজেই করতে পারে। কিন্তু সুশিক্ষা দানের ন্যায় ফরজ কাজটির দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কারণ, এ কাজটি জীবিকা সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত একজন সাধারণ মানুষের দ্বারা হয়না। একাজটি প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের। এ কাজটি সুষ্ঠ ভাবে সম্পাদিত করার জন্য জনগণ রাষ্ট্রকে রাজস্ব দেয়। একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য ও কতটা সুশীল হবে সেটি নির্ভর করে শিক্ষাদানের ফরজ কাজটি কতটা সফল ভাবে পালিত হয় -তার উপর। একটি দেশে অবিচার, মিথ্যচার ও দুর্বৃত্তির প্লাবন দেখে নিশ্চিত বলা যায় সুশিক্ষা দানের কাজটি সঠিক ভাবে হয়নি। কোন রাষ্ট্রে এ কাজটি যথার্থ ভাবে না হলে জনগণ পথ হারায় এবং ধাবিত হয় জাহান্নামে দিকে। অনৈসলামী রাষ্ট্র তো সে কাজটিই করে। সেটি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কুর’আনের জ্ঞানদানকে বিলুপ্ত বা সংকুচিত করে। পৃথিবীপৃষ্ঠে একাজের চেয়ে ভয়ংকর নাশকতার কাজ দ্বিতীয়টি নাই। যুদ্ধ এখানে মহান আল্লাহ তায়ালার  এজেন্ডার বিরুদ্ধে। নিজ বান্দাদের জান্নাতের নেয়ার কাজে মহানর রব রাষ্ট্রকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করতে চান। শয়তান সেটিকেই ব্যর্থ করতে চায়। অপরাধ এখানে কোটি কোটি মানুষকে জাহান্নামের আগুনে নেয়ার। অথচ বাংলাদেশের মত অনৈসলামী দেশগুলিতে অতি ব্যাপক ভাবে হয় সে নাশকতার কাজগুলি। এবং সেটি জনগণের রাজস্বের অর্থে। ফলে এসব দেশে একজন ছাত্র তার ২০-২৫ বছরের শিক্ষা জীবন শেষ করে পবিত্র কুর’আনের একটি আয়াত বুঝার সামর্থ্য অর্জন না করেই। ফলে আদায় হয় না জ্ঞানার্জনের ফরজ। এমন কুর’আনী-জ্ঞানশূন্য ছাত্ররা সিরাতাল মুস্তাকীমে চলবেই বা কিরূপে? জান্নাতের পথই বা সে কিরূপে পাবে? এমন মানুষেরা দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়বে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? এরূপ অনৈসলামী প্রতিষ্ঠা দেয়া যেমন গুরুতর অপরাধ, তেমনি গুরুতর অপরাধ হলো সে রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখা। অথচ বাংলাদেশে কোটি কোটি নামাজী, রোজাদার ও হাজী সে অপরাধের সাথে জড়িত। তারা ভোট দিয়ে, রাজস্ব দিয়ে এবং রাজপথে লড়াই করে শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃত এ রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রেখেছে।       

রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে শয়তানের হাতিয়ারে                                                                       

জান্নাতের পথটি শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও দোয়া দরুদের পথ নয়। এ পথটি নানারূপ পেশাদারী, রাজনীতি, শিক্ষা সংস্কৃতি, দ্বীনের তাবলিগ, পরিবার পালন, প্রশাসন, বিচার-আচার, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধবিগ্রহের পথ। এমন সবগুলির মধ্য দিয়ে ধাবিত হয় সিরাতাল মুস্তাকীম। তাই জান্নাতের এ দীর্ঘ পথকে যারা শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, দোয়া দরুদ, সুফি খানকাহ, মসজিদ মাদ্রাসা ও ওয়াজ মাহফিলের মাঝে আটকে রাখতে চায় তাদের দ্বারা পূর্ণাঙ্গ সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার কাজটি হয়না। নবীজী (সা:)‌‘য়ের সূন্নতের অনুসরণের কাজটিও হয়না। তারা যেমন অপূর্ণাঙ্গ মুসলিম, তেমনি অপূর্ণাঙ্গ হলো সিরাতাল মুস্তাকীমে চলা। অথচ জান্নাতের যোগ্য হতে হলে তো পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হতে হয় এবং সিরাতাল মুস্তাকীমের পূর্ণ পথটি অতিক্রম করতে হয়। কোন অংশ বাদ রাখার সুযোগ নাই। এর অর্থ জীবনের প্রতি অঙ্গণে এবং প্রতি মুহুর্তে কুর’আনী রোডম্যাপ অনুসরণ করতে হয়। এখানে ব্যর্থ হওয়ার অর্থ সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হওয়া এবং জাহান্নামের যাত্রী হওয়া। যারা অপূর্ণাঙ্গ মুসলিম -তারা তো অনুসরণ করে শয়তানের সূন্নত। বরং তারা ইবলিসের চেয়েও বড় ইবলিস। ইবলিস একটি মাত্র হুকুম অমান্য করে অভিশপ্ত শয়তান হয়েছে; কিন্তু মুসলিম নামধারী ইবলিসগণ তো পদে পদে বিদ্রোহী ও অবাধ্য। মানবরূপী ইবলিস তো তারাই যারা রাজনীতিতে সেক্যুলারিস্ট, ফ্যাসিস্ট ও কম্যুনিস্ট, অর্থনীতিতে সূদখোর, আদালতে শরিয়া বিরোধী, অফিসে ঘুষখোর, দোকানে প্রতারক, ধর্মের নামে ধর্মব্যবসায়ী  এবং সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানী।     

ইসলামী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুধু দেশবাসীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত করা নয়, বরং নাগরিকদের মাঝে জান্নাতের পথে চলার সামর্থ্য সৃষ্টি করা এবং সে পথে চলাটি সহজ ও নিরাপদ করা। সেজন্য অপরিহার্য হলো, প্রতিটি নাগরিকের জন্য পূর্ণ ইসলাম পালনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা।  অথচ অনৈসলামী রাষ্ট্রগুলি করে উল্টোটি। নাগরিকদের মাঝে জান্নাতের পথে চলার সামর্থ্য সৃষ্টি করা দূরে থাক, সে পথে চলার অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়। এবং বঞ্চিত করা হয় পূর্ণ দ্বীন পালনের অধিকার। পূর্ণ দ্বীন পালনের অর্থ শুধু মসজিদ মাদ্রাস নির্মাণ নয়, বরং সেটির অর্থ বিদ্যালয়ে কুর’আন চর্চা, আদালতে শরিয়া, সূদমুক্ত অর্থনীতি  এবং সমাজ থেকে দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের মত অনৈসলামী রাষ্ট্রে এগুলির কোনটাই নাই। হাসিনা তো কুর’আনের তাফসির বন্ধ করতে আলেমদের কারাগারে তুলেছিল। জিহাদ বিষয়ক বই পেলে তাকে সন্ত্রাসী বলে রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে।  

সরকারের লোকেরা দেশবাসীর সামনে সিরাতাল মুস্তাকীমকে দৃশ্যমান করে না। বরং দেশের জাতীয়তবাদী সেক্যুলার রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি, প্রশাসনিক দুর্বৃত্তি, কুর’আন শূণ্য শিক্ষানীতি, ঘুষভিত্তিক অর্থনীতি, শরিয়ামুক্ত বিচার এবং সরকার অনুমোদিত পতিতালয় -এসব কিছুই ডাকে জাহান্নামের পথে। অনৈসলামী রাষ্ট্রে বসবাসের এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। এমন অভিশপ্ত রাষ্ট্রে মানুষ অনাহারে বা রোগেভোগে দ্রুত মারা না গেলেও বাঁচে, বেড়ে উঠে ও জীবন সাঙ্গ করে প্রতি দিন জাহন্নামের পথে চলে। মুসলিমদের গৌরব যুগে একটি মাত্র রাষ্ট্র ছিল। সে রাষ্ট্রটি ছিল ইসলামী, ফলে তার কল্যাণকর অবদান ছিল বিস্ময়কর। জান্নাতে নেয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি নাগরিকদের নানা ভাবে জান্নাতের মহাসড়কের উপর খাড়া করেছিল। সে ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণে বিশ্বের নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের মানুষ সেদিন জাহান্নামের পথ ছেড়ে জান্নাতের পথ পেয়েছিল।

অপরাধ কর্ম নিয়ে উৎসব এবং শত্রুশক্তির দখলদারি!

মুসলিম উম্মাহর শুরু একটি মাত্র ইসলামী রাষ্ট্র নিয়ে। সে রাষ্ট্রেটি তার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি নিয়ে মানব জাতির যে বিশাল কল্যাণটি করেছিল -তা আজকের ৫০টির বেশি মুসলিম রাষ্ট্র এবং সেগুলির ১৫০ কোটির অধিক মুসলিম জনগণ তা করতে পারছে না। এসব রাষ্ট্রের শাসকগণ সবাই মিলে মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক সীমানাকে এক ইঞ্চিও বাড়াতে পারিনি। বরং তাদের অপরাধের মাত্রাটি বিশাল। বহু মুসলিম ভূমিকে তারা কাফির শক্তির হাতে তুলে দিয়েছে। বহু মুসলিম দেশের মানচিত্রকে তারা খণ্ডিত ও সংকুচিত করেছে। আল্লাহ তায়ালা একতাকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন। কিন্তু যেসব সেক্যুলারিস্টগণ ইসলাম থেকে দূরে সরেছে -তারা হারাম-হালালের কুর’আনী বিধানকে পদদলিত করেছে। তারা শুধু নিজেদের স্বার্থ বুঝে, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ তাদের কাছে কোন মূল্য রাখে না। ফলে ক্ষমতার মোহে সেক্যুলারিস্টগণ মুসলিম দেশ ভাঙতে এমন কি পৌত্তলিক কাফির শক্তিকে নিজ দেশে ডেকে এনেছে। এরা যেমন খেলাফত ও পাকিস্তানকে ভেঙেছে, তেমনি ২২ টুকরোয় খণ্ডিত করেছে আরব ভূমিকে।

মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় নাশকতার কাণ্ডটি ঘটেছে মুসলিম বিশ্বকে খণ্ডিত করার মধ্য দিয়ে। বুঝতে হবে, বিভক্তির প্রকল্প মানেই বিশুদ্ধ শয়তানের প্রকল্প। বুঝতে হবে সেটি এক গুরতর অপরাধ। ভূ-রাজনৈতিক বিভক্তি কখনোই কোন ঈমানদারের প্রকল্প হতে পারে না। কারণ, পবিত্র কুর’আনের কোন একটি আয়াত এবং নবীজী (সা:)‘য়ের কোন একটি হাদীস পাওয়া যাবে না যা মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক বিভক্তিকে সমর্থণ করে। বরং সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে সাবধান করা হয়েছে বিভক্তি থেকে বাঁচতে। এবং যারা বিভক্তির পথ বেছে নেয় তাদেরকে শোনানো হয়েছে ভয়ানক আযাবের প্রতিশ্রুতি। এ থেকে বুঝা যায়, ভূ-রাজনৈতিক বিভক্তি মানেই বিশুদ্ধ বেঈমানী। সেটি সরাসরি বিদ্রোহ মহান রব’য়ের বিরুদ্ধে। মুসলিমদের মাঝে নানা মাজহাব, নানা ফিকাহ এবং নানা ফিরকার বিরোধ ও বিভক্তির ইতিহাস হাজার বছরের বেশী পুরনো। কিন্তু সে বিভক্তি মুসলিম উম্মাহর এতো ক্ষতি করেনি, যা করেছে ভৌগলিক বিভক্তি।  কারণ সে মজহাব ও ফিকাহগত বিরোধ নিয়েও মুসলিম উম্মাহর ভৌগলিক একতা ছিল। তখন মুসলিমদের হাতে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ ব্যাপী বিশাল ভূগোল ছিল। সে বিশাল ভূগোলের কারণে মুসলিম উম্মাহ একটি বিশ্বশক্তি রূপে গণ্য হতো। বাঘ ভালুক সিংহ যেমন হাতির গায়ে স্পর্শ করতে ভয়, তেমনি ঔপনিবেশিক ইউরোপীয়রা ভয় পেত উসমানিয়া খেলাফতকে স্পর্শ করতে |। তাই কলোনী খুঁজতে ইউরোপীয়দের মুসলিম মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকা বাদ দিয়ে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিতে হয়েছে। কিন্তু উসমানিয়া খেলাফতের সে বিশাল ভূগোল খণ্ডিত হওয়ার পর বিশ্বশক্তির মঞ্চ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে মুসলিম উম্মাহ। তখন অধিকৃত হয়েছে মুসলিম ভূমি এবং নির্মিত হয়েছে ইসরাইল।

বুঝতে হবে মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শুধু একক আল্লাহর উপর বিশ্বাস নয়, সে সাথে গুরুত্বপূর্ণ হলো মুসলিম উম্মাহর একীভূত বিশাল ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা। নইলে ইসলাম নিয়ে বাঁচা ও পালন করাই কঠিন হয়। একমাত্র শত্রুরাই সে অখণ্ড ভূগোলের বিভক্তি চাইতে পারে। মুসলিম উম্মাহর খণ্ডিত মানচিত্রের দিকে নজর দিলে বুঝা যায়, মুসলিম উম্মাহর উপর শয়তান ও তার অনুসারিদের বিজয়টি কত বিশাল। ফলে মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বড় মাতমের ঘটনা তো এই বিভক্তি।  কিন্তু সে সুস্থ কাণ্ডজ্ঞান ও বিবেকবোধ মুসলিমদের মধ্য থেকে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে।  ফলে সে বিভক্তি নিয়ে তারা মাতম করে না, বরং উৎসব করে। বাংলাদেশে সে উৎসব  প্রতি বছরে দেখা যায়  ১৬ ডিসেম্বর এলে। সে উৎসবে এমন কি তথাকথিত ইসলামী আন্দোলনের লেবাসধারীদেরও দেখা যায়। ১৯৭১’য়ের ভাঙা নিয়েই তাদের আনন্দ উৎসব, ১৯৪৭‘য়ের গড়া নিয়ে নয়। এবং সে বিভক্তিকে বাঁচিয়ে রাখা নিয়েই তাদের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও রণনীতি। এ|থেকে বুঝা যায়, সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে আজকের মুসলিমদের বিচ্যুতি কত বিশাল। এবং বুঝা যায়, ইসলামের কুর’আনী দর্শন তাদের মাঝে কতটা মৃত।  

মুসলিম দেশগুলির উপর বিদেশী শত্রুর অধিকৃতি শেষ হয়েছে। কিন্তু এখন চলছে ইসলামের দেশী শত্রুদের দখলদারি। দেশী শত্রুদের শাসনামলে অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রেই সুশাসন, গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার কবরে শায়ীত। প্রবল প্লাবন হলো দুর্বৃত্তির। ক্ষমতাসীন শাসকদের একটাই এজেন্ডা, সেটি হলো যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা। তারা নিজেরা হলো ইসলামী রাষ্ট্র, মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ার স্বঘোষিত শত্রু। অধিকৃত রাষ্ট্রগুলি নামে মুসলিম হলেও কার্যতঃ পরিণত হয়েছে শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার হাতিয়ারে। শাসকগণ নিজেরা হাইজ্যাক করেছে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব এবং বিলুপ্ত করেছে তার আইন। তারা প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তাদের নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও আইন। রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে জাহান্নামের বাহনে। পৃথিবী পৃষ্ঠে এর চেয়ে অধিক নাশকতার কাজ আর কি হতে পারে? এটি তো কোটি কোটি মানুষকে জাহান্নামের আগুনে নেয়ার নাশকতা। জনগণ সে নাশকতার শিকার হলেও নিষ্ক্রিয়। তারা বাঁচছে দখলদার শাসক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ নিয়ে। তাদের আত্মসমর্পণ যদি মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে হতো তবে কি তারা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে চলা এ নাশকতাকে কবুল করতো? ২৪/০৭/২০২৬