• ঢাকা |

রামিসারা কেন নিরাপদ নয়: বিচারহীনতা, নৈতিক অবক্ষয় ও আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মোহাম্মদ আবু হানিফ: একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সেখানে শিশু কতটা নিরাপদ। কিন্তু যখন সাত বছরের একটি শিশু নিজ বাসার আশপাশেই ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজের বিবেক প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। রাজধানীর মিরপুর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারের নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে অপরাধের নিষ্ঠুরতা বাড়ছে, অথচ মানবিকতা ও সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিবেশী সোহেল রানা শিশুটিকে নিজের ফ্ল্যাটের বাথরুমে নিয়ে যায়। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে মরদেহ টুকরো করে লুকিয়ে রাখার মতো পাশবিক ঘটনা শুধু অপরাধ নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর আঘাত। ঘটনার পর অভিযুক্তের পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং পরে গ্রেপ্তার হওয়া প্রমাণ করে—অপরাধীরা জানে কীভাবে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করতে হয়। এই বাস্তবতা আমাদের বিচারব্যবস্থা, সামাজিক কাঠামো এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতিকে নতুন করে সামনে এনেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা হত্যার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। অথচ সমাজে ভয়ের চেয়ে স্বাভাবিকতা যেন বেশি কাজ করছে। এর অন্যতম কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে প্রভাবশালী অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যায়। দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণের অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিচার প্রক্রিয়াকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বিধান থাকলেও বাস্তবে বহু মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালকে আরও কার্যকর করতে হবে। তদন্তে গাফিলতি বা বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ডিএনএ ল্যাব, ফরেনসিক ইউনিট এবং আলামত সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।

তবে সমস্যার মূল কেবল আইনের দুর্বলতা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও নৈতিক সংকটও। পরিবারে মূল্যবোধের শিক্ষা কমে যাচ্ছে, সহমর্মিতা হারিয়ে যাচ্ছে, ভোগবাদী ও বিকৃত মানসিকতা সমাজে বিস্তার লাভ করছে। শিশুকে “ফুলের মতো নিষ্পাপ” বললেও বাস্তবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। ধর্মীয়, মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—উভয় ক্ষেত্রেই জোরদার করা জরুরি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক উদাসীনতা। আমরা অন্যায় দেখি, কিন্তু প্রতিবাদ করি না। আশপাশে সন্দেহজনক আচরণ দেখেও নীরব থাকি। অনেক সময় ক্ষমতার প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক ভয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে মানুষ মুখ খুলতে চায় না। এই নীরবতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন অপরিহার্য।

গণমাধ্যমেরও বড় দায়িত্ব রয়েছে। শিশু নির্যাতনের ঘটনাকে শুধু চাঞ্চল্যকর সংবাদে পরিণত না করে, প্রতিরোধমূলক সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। ভিকটিমের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে, ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ করতে হবে এবং সমাজকে মানবিক বার্তা দিতে হবে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমাদের বুঝতে হবে—আজকের রামিসা শুধু একটি নাম নয়; সে আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রতীক। যদি আমরা এখনো নীরব থাকি, তাহলে আগামীকাল আরও অনেক রামিসার খবর শুনতে হবে।

আমাদের প্রয়োজন দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার, সামাজিক প্রতিরোধ, নৈতিক পুনর্জাগরণ এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন। প্রতিহিংসা নয়, আইনের শাসনের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে—এই দেশের প্রতিটি শিশু নিরাপদ।

লেখক 
যুগ্ম সম্পাদক
দৈনিক গণজাগরণ