কৌশলগত অংশীদারত্বে বাংলাদেশের আগ্রহ
এম এম রহমতুল্লাহ: গভীর ধর্মীয়, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও জোরদার করে কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
সৌদি আরবের ৯৬তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঢাকায় সৌদি দূতাবাস আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরও গভীর হবে এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সৌদি সরকারের ও জনগণকে জাতীয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ক কেবল প্রচলিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় বন্ধন, ঐতিহাসিক যোগাযোগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর এ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত।
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে দুই দেশের সহযোগিতা বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি, বন্দর, অবকাঠামো, খাদ্য নিরাপত্তা ও লজিস্টিকস খাতে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
ড. মঈন খান বলেন, সৌদি আরবের পুঁজি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা ও দক্ষ জনশক্তির সমন্বয় হলে উভয় দেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশে সৌদি আরবের উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশংসা করে তিনি বলেন, বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ অংশীদারত্বে রূপ দিতে বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত।
ধর্মীয় ও জনগণের সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও বাংলাদেশ-সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরও জোরদারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
তিনি দুই দেশের গভীর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ক প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক বিস্তৃত।
ডা. শফিকুর রহমান সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ-এর উদ্দেশে লেখা একটি অভিনন্দনপত্র সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহর কাছে হস্তান্তর করেন।
চিঠিতে তিনি বাংলাদেশের জনগণ ও নিজের পক্ষ থেকে সৌদি বাদশাহ, রাজপরিবার, সরকার ও জনগণকে জাতীয় দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
চিঠিতে সৌদি আরবের সঙ্গে বিশ্বের মুসলমানদের গভীর ধর্মীয় ও আবেগের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববী পরিচালনা ও সেবায় সৌদি আরবের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
হজ ও ওমরাহ পালন করতে বিভিন্ন দেশ থেকে সৌদি আরবে যাওয়া মুসলমানদের জন্য দেশটির সরকার ও জনগণের সহযোগিতা ও সেবারও প্রশংসা করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সৌদি আরবে বসবাসরত ও কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের অবদান বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করছে।
সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র
সৌদি জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ সংবর্ধনা এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বাংলাদেশ ও সৌদি আরব প্রচলিত সহযোগিতার পাশাপাশি নতুন নতুন ক্ষেত্রে সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ও **ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)**সহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামেও দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা করে আসছে।
আঞ্চলিক শান্তি, সংঘাত নিরসন এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতার কথাও অনুষ্ঠানে উঠে আসে।
প্রতিরক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ জানিয়েছিল, সৌদি রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার মধ্যে বৈঠকে দুই দেশের সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ, বিনিময় ও উন্নত প্রশিক্ষণসহ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
‘আমাদের গর্ব আমাদের প্রকৃতিতে’
এবার ‘Our Pride Is in Our Nature’ (আমাদের গর্ব আমাদের প্রকৃতিতে) প্রতিপাদ্যে সৌদি আরব তার ৯৬তম জাতীয় দিবস উদযাপন করছে। জাতীয় দিবসটি সৌদি আরবের জাতীয় পরিচয়, অর্জন এবং ভিশন ২০৩০-এর আওতায় দেশটির চলমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর সৌদি আরবে বসবাস ও কর্মসংস্থান, গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
সৌদি জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঢাকার সংবর্ধনায় দেওয়া বক্তব্যগুলোতে তাই ঐতিহ্যগত ধর্মীয় ও জনগণের সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।